Friday, February 3, 2023
Homeপৌরাণিকমহাদেবকে পতি রূপে পাওয়ার জন্য কোন উপায়ে বেছে নিয়েছিলো পার্বতী?

মহাদেবকে পতি রূপে পাওয়ার জন্য কোন উপায়ে বেছে নিয়েছিলো পার্বতী?

আদ্যাশক্তি মহামায়া সতী দেহত্যাগের পর কীভাবে নবজন্ম গ্রহণ করে আবার ফিরে এসেছিলেন এবং দেবাদিদেব মহাদেবকে পুনরায় পতি হিসেবে প্রাপ্ত হ‌ওয়ার জন্য কী উপায় অবলম্বন করেছিলেন সেই কথায় আজকে বলবো। শিব পুরাণের জ্ঞানসংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ে এই বিষয় বিশদে বর্ণিত আছে।

দক্ষযজ্ঞে স্বামী মহাদেব সম্পর্কে কটু কথা শুনে স্বেচ্ছায় দেহ ত্যাগ করেন আদ্যা শক্তি মহামায়া সতী। দেবীর দেহত্যাগের কথা শুনে তান্ডব লীলা শুরু করেন মহাদেব, দেবাদিদেব মহাদেব কে শান্ত করতে তখন ভগবান বিষ্ণু তার চক্রের দ্বারা সতীর মৃতদেহকে খন্ড খন্ড করেন। সতীর দেহ খণ্ড গুলি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পড়ে এবং সেগুলি এক একটি পীঠস্থান বা তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। সতীর মৃতদেহটি খন্ডিত হতে হতে নিঃশেষিত গেলে দেবাদিদেব মহাদেব তখন শান্ত হয়, তিনি প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে কৈলাসে তার স্থানে ফিরে যান এবং ধ্যানমগ্ন হয়ে যান। এক মহাযোগে বসেন তিনি, সতীর সঙ্গে তার বিবাহ তার সংসার, সতীর দেহত্যাগ প্রভৃতি ঘটনাগুলি যেন বিস্তৃতির অতলে হারিয়ে যেতে থাকে।

অন্যদিকে আদ্যা শক্তি মহামায়া সতীর অমর আত্মা নতুন দেহ পরিগ্রহণ এর জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। পর্বতরাজ হিমালয়ের পত্নী মেনকার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তিনি, সতীর নতুন জন্মে তার নাম হয় পার্বতী।
অন্যদিকে এই সময় তারক নামের একজন মায়াবী অসুর পুত্র তারকাসুর ব্রহ্মদেব কে তপস্যায় তুষ্ট করে দুটি বর লাভ করেছিলেন। প্রথম বরটি হলো, ব্রহ্মারসৃষ্ট ত্রিভুবনের মধ্যে তারকাসুরের থেকে বেশি বলবান যেন কেউ না হয় আর শিব বীর্য থেকে উৎপন্ন পুত্র যখন দেব সেনাপতি হয়ে তার উপর অস্ত্র নিক্ষেপ করবে তখন যেন তার মৃত্যু হয় অন্যথা অন্য কারো হাতে যেন তার মৃত্যু না হয়।- বলাই বাহুল্য যে তারকাসুর এই বর অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে চেয়েছিলেন তিনি ভাল মতোই জানতেন যে দেবাদিদেব মহাদেবের শক্তি সতী দেহত্যাগ করেছেন এবং দেবাদিদেব মহাদেব মহাযোগে উপবিষ্ট রয়েছেন। তিনি সতী ভিন্ন আর কাউকেই কখনো স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন না তাই তার বীর্য থেকে উৎপন্ন সন্তান লাভের বিষয় এক প্রকার অসম্ভব, পরোক্ষ ভাবে সে অমরত্ব‌ই প্রার্থনা করেছিলো বলা যায়।

শিববীর্য থেকে পুত্র সন্তান হওয়া সম্ভব নয় বুঝতে পেরে তারক আসুন নিজেকে অমর ভেবে তখন তিন ভুবনের মধ্যে রাজত্ব করতে শুরু করে। নিজের শক্তিতে মত্ত হয়ে স্বর্গমতো পাতাল তিন লোক‌ই জয় করে সে এবং তিন লোকের উপর অত্যাচার এবং প্রভুত্ব ফলাতে শুরু করে। শিব পুরাণে বর্ণিত আছে যে তিন ভুবনের মধ্যে যেখানে যা উত্তম বস্তু সে দেখতে পেত তাই সে গ্রহণ করত তার কাজে বাধা দেবার শক্তি বা সাহস কারো ছিল না, এমন কি বিশ্ব প্রকৃতি ও তাকে ভয় করে চলতো। তার রাজ্যে সূর্যের তেজ কখনো প্রখর হতো না। সূর্যদেব ভয়ে ভয়ে শান্তভাবে কিরণ দান করতেন। সেই কিরণের উত্তাপ রাজ্যের কারোর গায়ে লাগতো না। সমুদ্র দেব বহু ধন রত্ন দান করেছিল তার রাজ্যে। প্রতিদিন চন্দ্র উদিত হতো তার রাজ্যে। সব সময় অনুকূল বাতাস বইতো সেখানে। সমগ্র ত্রিলোক তার আঞ্জা পালন করে চলতো। এমনকি পৃথিবীতে যে সকল যঞ্জ অনুষ্ঠিত হতো সেই সকল যজ্ঞে পিতৃপুরুষ ও দেবতাদের সব হব্য কব্য গ্রহণ করতো তারকাসুর। ঋষি, যক্ষ,কিন্নর, দেবতা মানুষ সকলেই তার আজ্ঞাধীন দাসে পরিণত হয়েছিল। প্রধান প্রধান তীর্থ গুলিকে নিজের রাজ্যের মধ্যে নিয়ে এসেছিল তারকাসুর,স্বর্গের উদ্যানটিকে নিজের ভবনে নিয়ে এসেছিলো সে। বহু বছর তারকাসুর স্বেচ্ছাচারিতা করে সকলের উপর অত্যাচার করতে থাকে, একসময় দেবতারা তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ব্রহ্মার কাছে ছুটলেন।

ব্রহ্মাকে গিয়ে তারা বললেন যে,“ আমাদের সকল দুঃখের কারণ হলো তারকাসুর। তার অত্যাচারে আমরা সকলে উৎপীড়িত। আপনি অবিলম্বে তাকে নাশ না করলে আপনার সকল সৃষ্টি বিপর্যস্ত হবে”
ব্রহ্মা তখন বললেন,“যে তারকাসুর আমার দ্বারা এই শক্তি ঔদ্ধত্য লাভ করেছে আমি তাকে নাশ করতে পারিনা। তবে আমি না পারলেও এর উপায় তোমাদের বলে দিচ্ছি। শিব বীর্য থেকে উৎপন্ন পুত্রই একে বিনাশ করতে পারে। কিন্তু সে কাজ বড়ই দুর্লভ হে দেবগন তবে আমি একটা কথা ভেবেছি এ বিষয়ে দেখো তোমরা সেটা করতে পারো কিনা। মহাদেব এখন কৈলাস পর্বতের সূরম্য শিখরে যোগ নিরত অবস্থায় তপস্যা করছেন। পর্বতরাজ হিমালয়ের কন্যা উমা বা পার্বতী শিবকে পতি রূপে লাভ করার জন্য বিশেষ ব্যগ্র হয়ে উঠেছেন। দেবর্ষি নারদ তাকে তপস্যারত শিবের নিয়মিত পরিচর্যা করার পরামর্শ দেন সেই পরামর্শ অনুসারে পার্বতী দুজন সখীসহ শিবের নিকট প্রতিদিন গিয়ে তার সেবা ও পরিচর্যা করতে থাকেন। শিব মহাযোগী তিনি বিবাহ বা সংসার করতে চান না। তোমরা যদি যে কোনোভাবে হর পার্বতী মিলন ঘটাতে পারো তাহলেই তোমাদের কার্যসিদ্ধি হবে। একমাত্র জল ছাড়া যেমন কেউ আমার বীর্য ধারণ করতে পারে না তেমনি একমাত্র উমা বা পার্বতী ছাড়া অন্য কোন নারী শিববীর্য ধারণ করতে পারবে না। এই শিব বীর্য থেকে উৎপন্ন কোন কুমার‌ই ভবিষ্যতে দেব সেনাপতি রূপে তারকাসুরকে বধ করে তোমাদের উদ্দেশ্য সাধন করবে।”

দেবগণ এই কথা শুনে দেবরাজ ইন্দ্রকে গিয়ে সব কথা খুলে বললেন। দেবরাজ ইন্দ্র দেব কার্য সাধনের জন্য কামদেব মদন দেবকে আহবান করলেন। মদন দেব জানালেন যে তিনি তার কামবানের দ্বারা মহাদেবেরও ধ্যান ভঙ্গ বা ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারেন। দেবরাজ ইন্দ্রের কথায় সম্মত হয়ে তিনি তার স্ত্রী রতি কে নিয়ে মহাদেবের তপঃভঙ্গ করতে উপস্থিত হলেন। শিব পুরাণে লেখা আছে যে, মদন দেব স্ত্রী রতির সঙ্গে মিলিত হয়ে চতুর্বান আকর্ষণ করে মহাদেবের চারপাশে অবস্থান করতে লাগলেন। এমন সময় সকল সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি দেবী পার্বতীর সেখানে আবির্ভাব ঘটলো। এই সময় মহাদেবের মনে কাম প্রবৃত্তি জন্মাবার জন্য কামদেব ধনুর্বান আকর্ষণ করলেন কিন্তু সাথে সাথে ধনুকটি হাত থেকে পাশে পড়ে গেল। পদ্মালোচনা পার্বতী যখন সেখানে গিয়ে মহাদেবকে দর্শন করলেন এবং তাকে প্রণাম করে তার পুজো করে সামনে দাঁড়ালেন তখন মহাদেব পার্বতীর দিকে দৃষ্টিপাত করে ভাবতে লাগলেন, “এ কি মুখ নাকি চাঁদ? একি চোখ না বিকশিত পদ্ম? এর ভ্রুযুগল যেন কন্দর্পের দুটি ধনুক। এর অধর পক্ব বিম্বের মতো। শুক পাখির চঞ্চুর মত এর নাসিকা। এর কন্ঠের কথা কোকিলের স্বর। এর গতি মরালীর গতি ভঙ্গি কেও হার মানায়‌। এর রূপ বা পরিধান বিষয়ে কিই বা বর্ণনা করবো? এই সংসারে যত কিছু লালিত্য বা লাবণ্য আছে তার সব যেন একত্রিত হয়ে এর দেহটিকে নির্মাণ করেছে।” এই কথা বলে তিনি তপস্যা হতে বিরত হলেন এরপর শিব পার্বতীর শাড়ির আঁচল ধরতে গেলে পার্বতী একটু সরে দাঁড়ালেন। নারী সুলভ লজ্জায় তার মুখখানা রাঙ্গা হয়ে উঠলেও অন্তরে তার প্রেমবোধ জেগে উঠলো।

এই সময় দেবাদিদেব মহাদেব বুঝতে পারলেন পার্বতী তার অভিলষিত নারী, এই নারী তার প্রেম লাভের উপযুক্ত, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি ভাবলেন যে তিনি কি নারী রূপে মুগ্ধ ও মোহপ্রাপ্ত হচ্ছেন? তিনি ঈশ্বর হয়ে যদি এমন কাজ করেন তাহলে মানুষেরা কি অন্যায় কার্যই না করবে! এই ভেবে বিবেক দংশন অনুভব করে তিনি তপস্যায় পুনরায় রত হওয়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছুতেই পারলেন না। তার ধ্যানভঙ্গ হলো। তখন এই ধ্যান ভঙ্গ করার কারণ অনুসন্ধান করতে লাগলেন তিনি, চারিদিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি কামদেব মদন ও রতিকে বাম পাশে দেখতে পেলেন। তিনি দেখলেন মদন তাকে লক্ষ্য করে ধনুর্বান আকর্ষণ করছে এই দেখে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন মহাদেব। তার তৃতীয় চোখ থেকে জ্বালাময় অগ্নিনির্গত হল। দেবাদিদেব মহাদেব বললেন যে,“ মদন তোর এত দূর স্পর্ধা যে আমার মত নিষ্কাম মহোযোগীর মনে কাম সঞ্চারের চেষ্টা করছিস! এই দুষ্কর্মের সমুচিত প্রতিফল তোকে পেতেই হবে।” এরপর মদন দেব মহাদেবের প্রজ্জ্বলিত নেত্রানলে মুহূর্তেই দগ্ধ ও ভস্মীভূত হয়ে গেলেন, মদন ভস্মের পর তার স্ত্রী রতী শোকে বিলাপ করতে লাগলেন। তিনি বলতে থাকলেন যে, দেবগন দেব কার্যসিদ্ধির জন্য আমার স্বামীকে ডেকে এনে একি করলেন! এখন আমি কোথায় যাব? কী করব?

রতির দুঃখে ব্যথিত হয়ে দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে তখন দেবতারা সমস্ত কথা ব্যক্ত করলেন। তারা বললেন কেন এমন কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন মদন দেব? বললেন তারকা সুরের অত্যাচারের কথা তার নিধনের কথা? সব কথা শুনে মহাদেব বললেন যে, যা হয়েছে তাকে আর ফেরানো যাবে না তবে খুব শীঘ্রই কামদেব কৃষ্ণ পত্নী রুক্মিনীর গর্ভে কন্দর্প রূপে আবার জন্মগ্রহণ করবে। তার পুনর্জন্ম না হওয়া পর্যন্ত সে অনঙ্গ বা বিদেহী রূপে অবস্থান করবে। পুনর্জন্ম হওয়ার পর সে পুনরায় রতির সাথে মিলিত হবে। সব কথা শুনে রতি শান্ত হলেন ও মহাদেবের নির্দেশ অনুসারে সমুদ্রতলে চলে গেলেন। এই সময় পার্বতী শিবের তপভূমি থেকে নিজের রাজপ্রাসাদে গিয়ে ভাবতে থাকলেন যে তার রূপ মহাদেব দেখেও প্রত্যাখ্যান করেছেন তাই সেই রূপকে তিনি ধিক্কার দিতে থাকলেন। উন্মাদিনীর মতো বারংবার শিব শিব করতে থাকলেন তিনি। এই সময় দেবর্ষি নারদ তার কাছে এসে বললেন,“ হে পর্বত দুহিতা মহাদেব কে কঠোর তপস্যা ছাড়া লাভ করার কোন উপায় নেই। তপস্যা ভিন্ন ব্রহ্মা,দেব গণ‌ও তাকে লাভ করতে পারে না।”পার্বতীকে এই কথা বলে নারদ হরিনাম করতে করতে সেখান থেকে চলে গেলেন। নারদের কথা শুনে মহাদেবকে পতি হিসেবে লাভ করবার জন্য পার্বতী তপস্যা করবার মনস্থ করলেন।

RELATED ARTICLES

Most Popular